কিছু একটা নেওয়ার জন্য বিছানা ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিলেন পারগালি ইব্রাহিম। বুকে হাত দিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন হুররেম।
‘উঠছেন কেন পারগালি? কিছু চাই?’
‘একটু হোসাফ দরকার।’
‘হোসাফ’
হুররেম খাতুনের চোখে বিস্ময়। নামটা সম্ভবত এই প্রথম শুনেছেন তিনি।
‘তোপকাপি প্রাসাদের কালফা হয়ে আপনি হোসাফ চেনেন না?’
‘আমাকে কালফা বলছেন কেন? হুররেম নামটা কী খারাপ? স্বয়ং সুলতান আমাকে এই নাম দিয়েছেন।’
‘নাম তো সুন্দর। কিন্তু এখানকার সব মেয়েকেই কালফা বলা যায়। এমনকি সুলতানের স্ত্রীকেও।
‘ও…তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু হোসাফটা কী?’
‘ওই যে।’
টেবিলের ডান কোণে রাখা পাত্রের দিকে আঙ্গুল তাক করলেন ইব্রাহিম। স্বভাবতই হুররেম খাতুনের চোখ ঘুরে গেছে সেদিকে।
‘ওই পাত্রে রাখা পানীয়টার নামই হোসা। এটা এক ধরনের সিরাপ অথবা চিনির সিরা দিয়ে রান্না করা একটা ফল। অটোমান সুলতানদের খুব প্রিয় পানীয়’
‘কিন্তু আপনি তো সুলতান নন?’
ইব্রাহিমের দিকে হুররেমের রহস্যময় চাউনি।
‘তা নই। কিন্তু হোসাফ পান করা নিশ্চয়ই অন্যায় নয়। কিলারসি ওস্তা আমার জন্য সব সময়ই এর মজুদ রাখে।’
‘কিলারসি ওস্তা? এ আবার কেমন নাম?’
‘এটা নাম নয়—পদবি। জাঁহাপনার খাবার—দাবাড়ের সংগ্রহশালা যিনি দেখাশোনা করেন তাকে কিলারসি ওস্তা বলে।’
‘আমার দেখি এখানকার অনেক কিছু শেখার বাকি।’
‘তাতো—বটেই। অনেক অনেক কিছু।’
ইব্রাহিম শীতল চোখে তাকালেন হুররেমের দিকে।
‘এই নিন আপনার হোসাফ।’
‘আপনি যতটা অসুস্থ ভাবছেন আমি কিন্তু ততটা অসুস্থ নই— খাতুন।’
পানীয়তে চুমুক দিতে দিতে বললেন ইব্রাহিম।
‘সেটা একটু পরই টের পাওয়া যাবে।’
বলেই কেমন করে যেন হাসলেন হুররেম। সে হাসি ইব্রাহিমকে কেবল মুগ্ধই করল না ব্যাকুলও করে তুলল। অথচ একটু আগেও পারগালি পরিস্থিতি থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কথা ভাবছিল। আর এখন? এখন রাত গভীর হয়েছে। অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা মিলেমিশে একাকার। শরীরে সুরার স্পর্শ। পাশে সুন্দরী কালফা। ভিতরের আদিম মানুষটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার জন্য এর চেয়ে ভালো পরিবেশ আর কী হতে পারে।
ঘরের ভিতরের আলোটা আরেকটু কমিয়ে দিয়েছেন হুররেম খাতুন। অল্প আলোতেও ধবধবে ফর্সা হুররেমকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। পারগালি ইব্রাহিমের রোগ—শোক কোথায় যেন দৌড়ে পালিয়েছে। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন। আঁেক উঠলেন হুররেম খাতুন।
‘পারগালি—কোন সমস্যা?’
ইশারায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার কথা জানালেন ইব্রাহিম। হুররেমের মুখে স্বভাবজাত হাসি। ইব্রাহিমের মাথায় তখন অন্য চিন্তা। সুলতানের প্রিয় বাদী হুররেম। তার সঙ্গে এমন রাত্রিযাপনের পরিণতি অনেক ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। এত বড় ধাক্কাটা সামলাতে পারবে তো ইব্রাহিম? নাকি হুররেম খাতুনকে নিজের ডেরায় ফেরত পাঠানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে? দ্বিধায় পড়ে যায় পারগালি। আরেকটা ব্যাপার হুররেমের আসার খবর মাহিদেভরান জানল কী করে?
ঘরে ফেরত আসতেই হুররেমকে জিজ্ঞেস করলেন পারগালি।
‘মাহিদেভরানের কথা কী যেন বলছিলেন। কী জেনে গেছেন তিনি?
‘এই যে সেদিন গোপনে আমি আপনার কাছে এসেছিলাম— সেটা।’
‘কীভাবে জানলেন?’
‘আপনার রক্ষীদের মধ্যে একজন মাহিদেভরানের বিশ্বস্ত চর।’
‘কে সে? আর আপনিই বা এত কথা জানলেন কী করে?’
‘তার নাম উম্মুস আলাতুন। আমি কীভাবে জানি সেটা না হয় আপনি না জানলেন।’
‘ও আচ্ছা।’
পারগালি ইব্রাহিমের মাথার ভিতর কোনো একটা চিন্তা কাজ করছে। হুররেম খাতুন পারগালিকে ভাবার সময় দিলেন কিছুক্ষণ।
‘রাতটা কী এভাবেই কাটিয়ে দেবেন জনাব?’
‘আপনি বরং চলে যান হুররেম। আসলেই রাত অনেক হয়েছে। বেশিক্ষণ এখানে থাকাটা ঠিক হবে না।’
‘হাঃ হাঃ হাঃ …’
উচ্চৈস্বরে হেসে উঠলেন হুররেম।
‘পারগালি যে কী বলেন! আপনার সেবা করার জন্য এত কষ্ট করে এত ঝুঁকি নিয়ে এলাম। আর আপনি কি না আমাকে এভাবে চলে যেতে বলছেন!’
‘সেটাই উত্তর নয় কি খাতুন?’
‘জি না জনাব।’
এক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন হুররেম। সঙ্গে সঙ্গেই ইব্রাহিমের ওপর চড়াও হলেন হুররেম খাতুন। অপ্রস্তুত ইব্রাহিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে গেল ঘটনা। ইব্রাহিমের ঠোঁট জোড়ার দখল নিয়ে নিয়ে নিয়েছেন হুররেম। ইব্রাহিম সরানোর তেমন একটা চেষ্টা করলেন না। কেবল নিশ্চুপ থাকলেন। শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকা হুররেমকে না পারছেন সরাতে না পারছেন নিজেকে সপ্রতিভ করতে। এভাবেই কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল।
আগুনের সামনে মোম গলবেই। আবার মোম পেলে আগুন দাউ দাউ করবেই। ঠেকাবে কে। এটাই যে নিয়তি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কী হলো কে জানে। ঝলকে উঠলেন ইব্রাহিম। হ্যাঁচকা টানে হুররেমকে বিছানায় ফেলে দিলেন। এবার উল্টো হুররেমের ওপর চড়াও হলেন। অলস শুয়ে বসে থাকা হাতগুলো ব্যস্ত হয়ে উঠল। বাক্য ছাড়াই কবিতা আওড়াচ্ছে ঠোঁট—জিহ্বা। দুজনের নিঃশ্বাস এক হয়ে আসে।
পারগালির ভদ্রসুলভ মানুষটা কোথায় যেন পালিয়েছে। এ এক অন্য পারগালি। ক্ষুধার্ত এবং হিংস্র। হুররেম তখন চোখ বন্ধ মোমের পুতুল। যেমনি নাচাও তেমনি নাচি। নাচতে পারলেই খুশি।
সময় বয়ে যাচ্ছে। রাতের শরীরে মেদ জমে। বার্ধক্য জড়ানো রাত নিশ্চিত মৃত্যুর পর ভোরের প্রতীক্ষা করে। অপ্রত্যাশিত উন্মাদনায় কাতর ইব্রাহিমও ক্লান্তি পেরিয়ে আরেকবার হোসাফের পেয়ালায় চুমুক দেন। শরীরে উত্তাপ থামাতে হাম্মাম খানায় ছুটেন। হুররেমই বা বাদ থাকবেন কেন? বস্ত্রহীন সোনার শরীর বেয়ে একেকটি জলবিন্দুকে যেন মুক্তোদানা মনে হয় ইব্রাহিমের। মেয়েটার এমন নির্লজ্জতা কী অবলীলায় গলাধঃকরণ করছে ইব্রাহিম। খুব বেশি চারিত্রিক দৃঢ়তা হয়তো কখনোই ছিল না তার। কিন্তু এভাবে লতার মতো নুইয়ে পড়ার মানুষও তিনি নন। তাহলে যে এই রাতে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল? ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না ইব্রাহিমের বিক্ষিপ্ত মন। কে জানে পুরোটাই হয়তো হুররেম খাতুনের জাদু! যে জাদু থেকে মুক্ত নন স্বয়ং সুলতানও!
‘আমি সুলতানের কক্ষে যেতে চাই। ইব্রাহিম, আপনি কী ব্যবস্থা করবেন?’
‘এই উদ্দেশ্যে নিয়েই কী আমার সেবা করতে এসেছিলেন হুররেম?’
‘পাত্র হিসেবে নিজেকে এতটা মন্দ কেন ভাবছেন? আপনি তো খেলোয়াড় হিসেবে মন্দ নন।’
‘তাই বুঝি?’
‘আমার কাছে তো সেটাই মনে হয়েছে। কেন, আপনার বুঝি ভালো লাগেনি?’
‘আমি কিন্তু সেই কথা বলিনি হুররেম।’
‘তাহলে বলুন কবে যাব সুলতানের কাছে। কবে ব্যবস্থা করবেন?’
‘যদি ব্যবস্থা না করি?’
‘তাহলে আবার আপনার সেবায় হাজির হয়ে যাব।’
‘যদি ব্যবস্থা করি তাহলে আসবেন না?’
‘তাহলেও আসব।’
‘তাহলে তো আমিই সর্বেসর্বা হয়ে গেলাম। সুলতানের বিষয়টা থাকল কোথায়?’
‘সুলতান সুলতানের জায়গায়। ইব্রাহিমের জায়গা আলাদা।’
‘তাই?’
‘হুমম। আর আমি জানি ইব্রাহিম ঠিকই আমাকে সুলতানের ঘরে পাঠাবে। যেমনটি প্রথমবার পাঠিয়েছিল। আবার এও জানি ইব্রাহিম যদি কোনো কারণে নাও পাঠান, তাহলে সুলতানই আমাকে ডেকে নেবেন। সেবার ক্ষেত্রে আমার ক্রিয়াকলাপ নিশ্চয়ই খুব মন্দ ছিল না।’
‘তা ছিল না।’
‘সুলতানেরও তাই মত।’
‘হুমম— আপনার সঙ্গে কথায় পারা যাবে না।’
‘হার মানলেন?’
‘সে তো আরও আগেই!’
‘শুনে খুশি হলাম।’
‘আমায় হারাতে এসেছিলেন বুঝি?’
‘না।’
‘তবে?’
‘আপনাকে জয় করতে।’
এবার পারগালি হেসে দিলেন।
‘যান। ঘুমুন গিয়ে।’
‘হুমম। এখনতো যেতে হবে। আশা করছি এই রাতটা আপনার মনে থাকবে।’
‘আলবৎ। মনে না থেকে উপায় আছে?’
হুররেমের ঠোঁটে এক টুকরো বিজয়ের হাসি।
বৃদ্ধ রাত যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের অপেক্ষায় তখনই পারগালির কক্ষ ত্যাগ করলেন হুররেম। আর একটা দ্বিধান্বিত সুখানুভূতি নিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন পারগালি।
সদ্য নির্মিত কুব্বেলতি বা রাজকীয় পরিষদ হঠাৎ করেই সরগরম হয়ে উঠেছে। সুলতান সুলেমান খান ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক পর পর এটি নির্মিত হয়েছে। এখনো বেশকিছু কাজ বাকি। এরপরও এখানেই রাজ পরিষদের কাজ শুরু করে দিয়েছেন সুলেমান খান। পীরে মেহমুদ পাশা, আহমেদ পাশা, ফেরাত পাশা সবাই আছেন। আহমেদ পাশা ছাড়া সবাইকেই উত্তেজিত মনে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা সম্ভবত সিমুন সামেরের। ঘটনা ঘটে গেছে। পারগালি ইব্রাহিমের দেওয়া ধারণা মতো পাতলা অথচ দ্রুতগামী জাহাজ তৈরি হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা এই জাহাজ বেশ কার্যকরী হবে বলেও বিশ্বাস করছে সবাই। সুলতানকে দেখানোর জন্য সেই জাহাজের ছোট্ট একটি নমুনা নিয়ে এসেছে সিমুন সামের। পোরসেলিনের বড় পাত্রে পানি ঢেলে সেই জাহাজ পানিতে ভাসিয়ে সুলতানকে এর নানা দিক তুলে ধরলেন সামের। মন দিয়ে সবাই সামেরের কথা শুনল। এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় একজন অনুপস্থিত। যে কখনোই কোথাও অনুপস্থিত থাকে না। কেউ সেটা খেয়াল না করলেও সুলতান ঠিকই খেয়াল করলেন।
‘পারগালি ইব্রাহিমকে দেখছি না যে?’
এদিক—ওদিক তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন সুলেমান। কেউ জবাব দিল না। তবে আহমেদ পাশা ছোট্ট করে বললেন—
‘এই ভিনদেশি লোকটা এমনই কাণ্ডজ্ঞানহীন। এমন সভায় কেউ অনুপস্থিত থাকে?’
ছোট করে বললেও কথাটা কানে গেল সুলতানের।
‘আহমেদ পাশা, যুক্তি ছাড়া কথা বলবেন না। সে অসুস্থও থাকতে পারে। তাকে কখনোই দায়সারা কিছু করতে দেখিনি। খোঁজ নিন তার কী অবস্থা।’
আহমেদ পাশা কেবল মাথা ঝোঁকালেন। জাহাজের বিষয়ে আরেকটু আলোচনা হলো। কামানের খোঁজও নেওয়া হলো। শিগগিরই অস্ত্রাগার পরিদর্শনে যাবেন সুলতান। সেই মতো প্রস্তুত থাকতে বলা হলো সবাইকে। সভার কাজ যখন শেষের পথে, তখন সুলতান নিজেই পারগালি ইব্রাহিমের খোঁজে যেতে চাইলেন। পীরে পাশা নিষেধ করতে গিয়েও থেমে গেলেন। যেহেতু সুলতান এটাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছেন, তাকে আটকানোর চেষ্টা করে লাভ নেই।
ঘরের অবস্থা যাচ্ছেতাই। ইব্রাহিম তখনো বেঘোরে ঘুমুচ্ছেন। এর মধ্যেই সেখানে সুলতানের পা।
‘ইব্রাহিম…ইব্রাহিম..।’
স্বপ্ন নাকি বাস্তব সেটা বুঝতে না পারলেও ঠিক লাফিয়ে উঠলেন ইব্রাহিম পাশা। সুলেমানের গলা চিনতে কষ্ট হলো না। লাফিয়ে উঠে সামনে তাকিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। তার কক্ষে দাঁড়িয়ে সুলতান সুলেমান। তাহলে কী সব শেষ। হুররেম খাতুন কী বেইমানি করল? নাকি অন্য কেউ সুলতানের কাছে গিয়ে সব ফাঁস করে দিয়েছে? সুলতান কী সত্যি কিছু জেনে গেছেন? নইলে এভাবে তার কক্ষে কেন ছুটে আসবেন?
ইব্রাহিমের দ্রুত গতির ভাবনায় ছেদ টানলেন সুলতান।
‘ইব্রাহিম, তুমি কী অসুস্থ? এখনো ঘুমাচ্ছ যে?’
স্বস্তি ফিরল ইব্রাহিমের মনে। একটু আগেও গর্দান যাওয়ার ভয়ে ভীত ছিলেন। ঢোক গিললেন প্রাণ ভরে।
‘জি হুজুর গতকাল অসুস্থ ছিলাম। এখন কিছুটা ঠিক বোধ করছি। আমি দুঃখিত সময় মতো ঘুম থেকে উঠতে পারিনি। আপনি কেন কষ্ট করতে গেলেন? আমাকে তলব করলেই আমি ছুটে যেতাম হুজুর।’
‘না। ঠিক আছে। তুমি বিশ্রাম নাও।’
বলেই ঘরের এদিক সেদিক একটু তাকালেন।
‘কাউকে ডেকে এগুলো একটু পরিষ্কার করিয়ে নাও। এভাবে থাকালে তো সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে।’
লজ্জা পেলেন ইব্রাহিম। মাথা নুইয়ে কেবল জি হুজুর বললেন।
‘ইব্রাহিম…বন্ধু কী খবর?’
বেশ উচ্চৈঃস্বরে বলতে বলতে ইব্রাহিমের কক্ষে ঢুকলেন মাতরাকচি নাসু। তিনি জানতেন না ভিতরে সুলেমান আছেন। কারণ এখানে ঢোকার আগে রক্ষীদের থাকতে বারণ করেছেন সুলতান নিজে। মাতরাকচি ভেবেছেন ঘরের ভিতর ইব্রাহিম একাই আছেন। কিন্তু ভিতরে ঢোকার পর চমকে গেলেন।
‘সুলতান…মাফ করবেন। আমি জানতাম না আপনি এখানে। আমি দুঃখিত। আমি চলে যাচ্ছি।’
পেছনে পা ফেলে কক্ষ ত্যাগ করতে যাচ্ছিলেন মাতরাকচি। সুলতান ফেরালেন তাকে।
‘আপনারা দুজন বন্ধু নাকি? মাতরাকচি?’
ইব্রাহিম আর মাতরাকচি দুজনকেই লজ্জিত মনে হলো। দুজনেই চুপচাপ।
‘কই ইব্রাহিম আমাকে তো বলনি যে তোমার কোনো বন্ধুও আছে?’
‘হুজুর সবে বন্ধুত্ব হলো। উনার মতো জ্ঞানী মানুষকে বন্ধু বানাতে পেরে আমি খুব খুশি। কথা বলতে বলতেই বন্ধুত্বটা হয়ে গেল।’
‘ভালো। খুবই ভালো। আমিও খুব খুশি যে তোমার অন্তত একটা বন্ধু তো জুটল। আমার ব্যাপারে তোমার কী রায় ইব্রাহিম?’
‘জি জাঁহাপনা? আমি ঠিক বুঝতে পারিনি আপনি কী জানতে চেয়েছেন।’
‘মানে মাতরাকচি জ্ঞানী মানুষ। বন্ধু হিসেবেও তিনি দারুণ। আর আমি? বন্ধু হিসেবে আমি কেমন?’
‘মাফ করবেন। আপনি তো আমার সুলতান। আমি আপনার দাস।’
ইব্রাহিমের কণ্ঠে বিনয়। মাতরাকচি তখন নীরব দর্শক।
‘সে তো অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান আর খাস কামরা প্রধানের সম্পর্ক। আমি ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা বলছি।’
‘আপনি অসাধারণ মানুষ। আপনার জন্য এই অধম হাসি মুখে প্রাণ বিসর্জন দিতে তৈরি।’
‘সেটা আমি জানি ইব্রাহিম। আরেকটা কথা মনে রেখ আমি সব সময়ের জন্য তোমার বন্ধু এবং ভাই। এই পচিয়টা আগে। এরও অনেক পরে আমি সুলতান। মনে থাকবে?’
‘জি।’
‘মাতরাকচি পাতলা অথচ দ্রুতগামী জাহাজ তৈরি হয়ে গেছে। ধারণাটা ইব্রাহিমের। ইব্রাহিম সুস্থ হলে তাকে নিয়ে একবার দেখে আসবেন।’
‘অবশ্যই সুলতান।’
‘আর আপনার বন্ধুর দিকে খেয়াল রাখবেন।’
জবাবে মাথা নুইয়ে হাসলেন মাতরাকচি। সুলতান গুটি গুটি পা ফেলে বেরিয়ে গেলেন।
ইব্রাহিম আর মাতরাকচি দুজনেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। মাতরাকচি একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন ইব্রাহিমের দিকে। কিছুক্ষণ কাটতেই বিষয়টি খেয়াল করলেন ইব্রাহিম।
‘মাতরাকচি… এভাবে তাকিয়ে আছেন যে!’
‘নাহ।’
‘কিছু বলবেন।’
‘না।’
আবার চুপচাপ। এবার ইব্রাহিমের ঠোঁটে হাসি।
‘মাতরাকচি, আমি জানি আপনি দুর্দান্ত মেধাবী এবং বুদ্ধিমান একজন মানুষ।’
‘সুলতানের বন্ধু হয়ে পারগালি বুঝি আমায় আবার আপনি করে বলা শুরু করলেন।’
একটু বিব্রত মনে হলো পারগালিকে। সামলে নিয়ে বললেন।
‘না। সেরকম না। আসলে অভ্যাস তো। যা বলছিলাম। আমি জানি তুমি অনেক কিছু বুঝতে পার।’
‘তাহলে বলে ফেল কাল রাতটা কেমন কেটেছে।’
‘মাতরাকচির ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি।’
‘তুমি সব জানো?’
‘আমি হুররেম খাতুনকে বেরিয়ে যেতে দেখেছি। রাতেই সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু তোমাকে বিরক্ত করতে চাইনি।’
‘আমার ওপর গোয়েন্দাগিরি?’
‘এই সুযোগ তুমিই আমাকে দিয়েছ।’
‘কীভাবে? তোমার কক্ষের পাশে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছ। আমি কী আর চোখ কান বন্ধ রেখে থাকতে পারি?’
‘তুমি আসলেই একটা জিনিস মাতরাকচি। নাস্তা করেছ।’
‘আমি করেছি। তোমার তো কিছুই খাওয়া হয়নি।’
‘খাব।’
‘রাতে বুঝি খুব ধকল গেছে?’
পারগালির ঠোঁটে হাসি।
‘না, সেরকম কিছু নয়। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।’
‘কী সেটা।’
‘ভাবছি যেটা ঘটে গেল, সেটা কী ঠিক হলো? আমি আবার বড় কোনো ভুল করে বসলাম না তো মাতরাকচি।’
‘ভুল শুদ্ধ জানি না। তবে বিষয়টা যেভাবে ঘটেছে বলে অনুমান করছি এতে তোমার করার কিছুই ছিল না।’
‘সত্যি করার ছিল না মাতরাকচি। বিশ্বাস কর হুররেমকে আমি এখানে ডাকিনি। আগেরবারের মতো এবারও সে নিজেই এসেছে। আর পুরো পরিস্থিতিটা কীভাবে যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল।’
‘হুমম। আমি অনুমান করতে পারছিলাম। এখন স্পষ্ট হলো।’
‘তোমার কী ধারণা মাতরাকচি? আমি কী ভুল করলাম।’
‘উহু। চলুক। একটু সাবধান থাকতে হবে। সুস্থ হয়ে কাজে মন দাও। ওসব ব্যাপার মন থেকে ঝেড়ে ফেল।’
‘কিন্তু হুররেম?’
‘অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।’
এর মধ্যেই ইব্রাহিমের জন্য নাস্তা চলে এসেছে। নাস্তা সেরে অস্ত্রাগারে যাওয়ার কথা ভাবলেন। মাতরাকচির খোঁজ করে জানলেন তিনি তার কক্ষে নেই। একা একা বের হতে ইচ্ছে করছে না ইব্রাহিমের।
‘সারা রাত কোথায় ছিলে হুররেম?’ এই প্রশ্ন করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে ইসাবেলা। হুররেম কোনো উত্তর দিচ্ছে না। কেবল মিটিমিটি হাসছে। অনেক চেষ্টার পর মুখ খুলল হুররেম।
‘সত্যিটা জানলে আবার মন খারাপ হবে না তো?’
‘আশ্চর্য! আমার মন খারাপ হবে কেন? কোথায় ছিলে সারারাত?’
‘পারগালি ইব্রাহিমের সঙ্গে।’
‘অসম্ভব!’
আঁতকে ওঠে ইসাবেলা। চোখে মুখে তীব্র অবিশ্বাস। হুররেম কেবল হাসে।
‘তোমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে না করলে কর না। যেটা সত্য সেটাই বললাম।’
‘আমায় ছুঁয়ে বল তুমি গিয়েছিলে।’
‘এই যে ছুঁয়ে বলছি। আমি সত্যি সারা রাত ইব্রাহিমের সঙ্গে ছিলাম। এবং মিথ্যে বলব না রাতটা বেশ উপভোগ্য ছিল।’
এবার উচ্চৈঃস্বরে হাসল হুররেম। ইসাবেলা দ্বিধান্বিত। বরাবরই হুররেম খাতুনকে বেশ দুর্বোধ্য মনে হয় তার কাছে। এই মুহূর্তে হুররেমঘটিত রহস্যটা আরও বেশি গাঢ় হয়ে উঠেছে তার কাছে। নিজে নিজেই ঘটনাটার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে ইসাবেলা।
‘এখন সব আমার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। খুব অল্প দিনের মধ্যেই গোটা সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেব আমি। দেখবে সবাই আমার গুণগান করবে।’
ইসাবেলা কোনো কথা বলল না। নীরবে হুররেমের দিকে তাকিয়ে থাকল কেবল। ঘটনাটা কিছুতেই মানতে পারছে না সে। হুররেমের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝল অবিশ্বাসেরও কোনো উপায় নেই। হুররেম সত্যি ঘরের বাইরে ছিল। আর সেটা যদি পারগালির সঙ্গেই হয়ে থাকে, তাও অবিশ্বাস করবে কী করে?